ইরান যুদ্ধে চাপে যুক্তরাষ্ট্র, কমছে ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত

0
Tarardeshnews
image_pdfimage_print

ঢাকা

শনিবার

৮ আগস্ট ২০২৬

২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | তারারদেশ নিউজ:

 

ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতে নতুন ধরনের চাপের মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একদিকে তেহরান এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে পাল্টা আঘাত চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে, অন্যদিকে মার্কিন বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে আসছে। ফলে যুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করার সামরিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতের প্রস্তুতি নিয়ে ওয়াশিংটনের ভেতরেই উদ্বেগ বাড়ছে।

 

মার্কিন প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর চাপের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে থাড ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বিভিন্ন সূত্রের হিসাবে, ইরানের হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের থাড ইন্টারসেপ্টরের বড় অংশ এবং প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের প্রায় অর্ধেক ব্যবহার হয়ে গেছে।

 

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (CSIS) হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আধুনিক দুই ধরনের প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার প্রায় ২ হাজার ২০০টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ৪৫২টি থাড ইন্টারসেপ্টর ছিল। যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় এসব অস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

 

শুধু প্রতিরক্ষাই নয়, কমছে আক্রমণাত্মক অস্ত্রও

 

ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার নির্ভুল অস্ত্রের মজুতও ক্ষয় হয়েছে। আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম (ATACMS), প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল এবং টমাহকের মতো অস্ত্র ব্যবহারের ফলে ভবিষ্যৎ সামরিক অভিযানে পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

 

টমাহক নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের হিসাবে, চলমান সংঘাতে এই ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবহার করেছে মার্কিন বাহিনী। এর ফলে নতুন করে বড় ধরনের অভিযান শুরু করলে অস্ত্রের সরবরাহ ও পুনর্গঠন সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

 

মিত্রদের নিরাপত্তা নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ

 

মার্কিন সামরিক মজুত কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু ওয়াশিংটনের ওপর সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। এসব দেশের নিরাপত্তার একটি বড় অংশ মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।

 

ইরানের সঙ্গে নতুন করে বড় সংঘাত শুরু হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ইরানি হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সেই পরিস্থিতিতে সীমিত হয়ে আসা মার্কিন প্রতিরক্ষা সক্ষমতা মিত্রদের সুরক্ষার ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।

 

যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে ওয়াশিংটন

 

এই বাস্তবতায় সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও গুরুত্ব পাচ্ছে। মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার ঝুঁকি নিয়ে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্থলবাহিনী পাঠানোর বিষয়ে অনাগ্রহী। তাঁর অবস্থান হলো বিমান হামলা ও সামরিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনা। তবে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, কেবল আকাশপথের অভিযান দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে ঘোষিত সব লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হতে পারে।

 

সম্প্রতি ইরানে আরও বড় হামলার একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প সেটি থেকে সরে এসেছেন বলে একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সঙ্গে আলোচনাও সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

আত্মসমর্পণের দাবি মানবে না ইরান

 

অন্যদিকে ইরান যুদ্ধ থামাতে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা সীমিত করার কোনো শর্ত মেনে নিতে প্রস্তুত নয় বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।

 

তিনি বলেছেন, ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার চেষ্টা হলে দেশটি প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে। একই সঙ্গে ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়ার কোনো প্রস্তাবও গ্রহণ করা হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।

 

পেজেশকিয়ান আরও অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছে। তেহরান অবশ্য মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

 

হরমুজ ঘিরে নতুন সমীকরণ

 

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তেহরান ও আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা চলছে।

 

ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনায় থাকা একটি সম্ভাব্য ব্যবস্থার মাধ্যমে হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ইরানের প্রভাব বাড়তে পারে বলে আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদন এসেছে। তবে প্রস্তাবটির কাঠামো এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি।

 

জাহাজ চলাচলের সম্ভাব্য ফি নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে। ইরান কার্গোর মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ ফি চাইলেও ওমানের প্রস্তাব প্রায় ৩ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র কোনো ফি আরোপের পক্ষে নয়।

 

ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছেন, ওমানের সঙ্গে আলোচনায় মৌলিক বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিকভাবে খুলে দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে আগের সমঝোতার শর্তে ফিরে আসতে হবে বলে তেহরানের অবস্থান।

 

অস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনে সময় লাগবে

 

যুদ্ধের কারণে কমে যাওয়া অস্ত্রের মজুত পূরণে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। প্যাট্রিয়ট ও থাড ব্যবস্থার রকেট মোটর উৎপাদন বাড়াতে নতুন চুক্তিও করা হয়েছে।

 

তবে দ্রুত মজুত পুনর্গঠন করা সহজ হবে না। অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হওয়ায় যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। CSIS-এর হিসাবেও থাডের মজুত পুনর্গঠনে তিন বছর বা তার বেশি সময় লাগার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

এই পরিস্থিতি শুধু বর্তমান সংঘাতের হিসাবেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। যুক্তরাষ্ট্র একই সময়ে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়াকে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে একটি দীর্ঘ ইরান যুদ্ধ মার্কিন সামরিক মজুতের ওপর যে চাপ তৈরি করছে, তার প্রভাব ভবিষ্যৎ সংঘাতের প্রস্তুতিতেও পড়তে পারে।

 

সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ এখন আর শুধু সামরিক শক্তির মুখোমুখি লড়াই নয়। ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত, মিত্রদের নিরাপত্তা, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, কূটনৈতিক সমঝোতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ঝুঁকি একসঙ্গে যুক্ত হয়ে সংঘাতটির পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণ করছে।

About Post Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *