গুগল, মেটা ও টিকটকের বিনিয়োগ প্রস্তাব, সম্ভাবনার নতুন দুয়ার কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে

0
image_pdfimage_print

ঢাকা

শনিবার

৮ আগস্ট ২০২৬ ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি | তারারদেশ নিউজ:

 

বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। গুগল, মেটা ও টিকটকসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বিনিয়োগের প্রস্তাব পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।

 

শনিবার গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক পরিদর্শনকালে এসব তথ্য জানান তিনি। দেশের প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বর্তমান অবস্থা, বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ সরেজমিনে পর্যালোচনা করতেই মন্ত্রীর এই সফর।

 

মন্ত্রী জানান, কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে বর্তমানে ৮৫টি প্রতিষ্ঠানকে জমি বা প্রস্তুত স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৭টি বিদেশি প্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে ৪০টি কোম্পানি ব্যবসা বা উৎপাদন শুরু করেছে। আরও ২৮টি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ চলছে এবং ১৭টি প্রতিষ্ঠান শিগগিরই নির্মাণে যাবে।

 

পার্কটিতে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের মোট পরিমাণ প্রায় ১৬৩ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ইতোমধ্যে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ২৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার এখন পর্যন্ত ব্যয় করেছে ৫০০ কোটি টাকার বেশি।

 

বিদেশি বিনিয়োগের বড় সম্ভাবনা

 

চীন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সাতটি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৬২ কোটি ৯০ লাখ ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে বলে জানান মন্ত্রী।

 

তাঁর মতে, এসব বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক শুধু দেশীয় প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। উৎপাদন, সংযোজন, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং রপ্তানির জন্য এটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

 

পার্কে বর্তমানে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ফাইবার অপটিক্যাল কেবল, গাড়ি, এটিএম ও ক্যাশ রিসাইকেলার মেশিনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন হচ্ছে। আইওটি ডিভাইস, রাউটার, সুইচ, সিসিটিভি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র, রেফ্রিজারেটর, বিভিন্ন হোম অ্যাপ্লায়েন্স এবং চিকিৎসা প্রযুক্তির সরঞ্জামও তৈরি হচ্ছে সেখানে।

 

দুটি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে ডেটা সেন্টার স্থাপনের কাজ করছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি কোম্পানির প্রস্তাবিত এআই ডেটা সেন্টার প্রকল্পে গুগল, মেটা ও টিকটকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ আগ্রহ রয়েছে।

 

কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ

 

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, হাইটেক পার্কের ব্যবসায়িক পরিবেশ ও অবকাঠামো যথাযথভাবে গড়ে উঠলে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।

 

প্রযুক্তি খাতে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি প্রযুক্তিপণ্যের অবস্থান শক্তিশালী করার সম্ভাবনাও দেখছে সরকার।

 

এ লক্ষ্যে বিনিয়োগকারীদের জন্য কর ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক-কর সুবিধা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসেবায় ভ্যাট সুবিধা এবং প্রযুক্তিপণ্যের তালিকা সম্প্রসারণের প্রস্তাব রয়েছে।

 

একই সঙ্গে শুধু উৎপাদনকারী নয়, অ্যাসেম্বলিং প্রতিষ্ঠানগুলোকেও প্রণোদনার আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। ইভি ব্যাটারি, সৌর ব্যাটারি, ইউপিএস ব্যাটারি ও ই-বাইকের মতো উদীয়মান প্রযুক্তি খাতের জন্য আলাদা প্রণোদনা কাঠামোর কথাও জানিয়েছে সরকার।

 

অবকাঠামো উন্নয়নকে গুরুত্ব

 

বিনিয়োগের সম্ভাবনার পাশাপাশি হাইটেক পার্কের কিছু সীমাবদ্ধতাও চিহ্নিত করা হয়েছে। অসম্পূর্ণ অবকাঠামো দ্রুত শেষ করা, নিরাপত্তা ও সিসিটিভি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে দ্বৈত সংযোগ স্থাপন এবং গ্যাসলাইন সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

 

এ ছাড়া বিনিয়োগকারীদের জন্য কাস্টমস সেবা, নিয়মিত রেল যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও সামাজিক অবকাঠামো নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের দ্রুত সেবা দিতে জনবল ঘাটতি পূরণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

 

মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমেয় নীতিগত সুবিধার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে বিনিয়োগের গতি আরও বাড়বে। এর ফলে দেশে প্রযুক্তিপণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ার পাশাপাশি উচ্চ দক্ষতার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

 

পরিদর্শনকালে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুর রহমানসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

 

সফরের শুরুতে মন্ত্রী কালিয়াকৈরে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, বাংলাদেশের একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন।

About Post Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *