রাজস্ব সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর একগুচ্ছ নির্দেশনা, করদাতার আস্থা ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় জোর
ঢাকা
১৯ আগস্ট ২০২৬ইং
০৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,
শিমুল মাহমুদ | তারারদেশ নিউজঃ-
৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে এনবিআর
তারারদেশ নিউজ | ঢাকা
রাজস্ব প্রশাসনে কাঠামোগত সংস্কার, করদাতাদের আস্থা বৃদ্ধি, কর ব্যবস্থাকে সহজ ও হয়রানিমুক্ত করা এবং ডিজিটাল ও তথ্যভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব নির্দেশনা দেন।
দিনব্যাপী আয়োজিত এ সম্মেলনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাজস্ব আহরণে বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং প্রয়োজনীয় সমস্যা সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একই করদাতার ওপর বারবার করের বোঝা বাড়িয়ে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। বরং কর প্রদানে সক্ষম নতুন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করে করজালের আওতায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, আধুনিক কর প্রশাসনের লক্ষ্য শুধু বেশি কর আদায় করা নয়; বরং অধিক সংখ্যক মানুষকে স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত করা। এজন্য করদাতা ও রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি।
কর প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করার পাশাপাশি দুর্নীতির সুযোগ কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
‘এনবিআরকে মানুষ ভয় নয়, বিশ্বাস করবে’
রাজস্ব প্রশাসনকে জনবান্ধব করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করদাতারা যেন এনবিআরকে ভয় না করে বরং আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা হিসেবে দেখতে পারেন, সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
তার মতে, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও তথ্য-উপাত্তের কার্যকর ব্যবহার ছাড়া আধুনিক রাজস্ব প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। কর প্রদানে সক্ষম ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে একটি সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমস্যা শুনলেন প্রধানমন্ত্রী
সম্মেলনে এনবিআরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জনবল সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, পরিবহন সমস্যা এবং বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে আন্তঃসংযোগের ঘাটতির কথা তুলে ধরেন।
শুল্ক মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনারেটের কমিশনার নাহিদা ফরিদি মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের কাজের পরিবেশ এবং অতীতের বিভিন্ন সংকটের বিষয়ও প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন।
তিনি জানান, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে কর্মকর্তাদের মধ্যে কর্মস্পৃহায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। এর প্রভাব রাজস্ব আহরণেও পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী অতীতের সংকট নিয়ে পড়ে না থেকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের উত্থাপিত সমস্যাগুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে বলে আশ্বাস দেন।
রাজস্ব সম্মেলনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্যে। তিনি জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দুটি পৃথক ও স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানে বিভক্ত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় একটি প্রতিষ্ঠান রাজস্ব নীতি প্রণয়ন এবং অপরটি রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে।
অর্থমন্ত্রী জানান, রাজস্ব নীতি প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানটি সরকারের ‘থিংক ট্যাংক’ হিসেবে কাজ করবে। বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, প্রতিযোগিতামূলক ও বিনিয়োগবান্ধব কর কাঠামো তৈরির লক্ষ্য থাকবে এ প্রতিষ্ঠানের।
অন্যদিকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানটি মাঠপর্যায়ে রাজস্ব আদায় ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বাস্তবায়নে কাজ করবে।
সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার নির্দেশ
সম্মেলনের বিভিন্ন স্টল পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী কাস্টমসের পণ্য খালাস প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চান।
পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে কোথায় জটিলতা রয়েছে এবং কীভাবে সময় কমিয়ে সেবার মান বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে তিনি জানতে চান।
এ সময় জাতীয় সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। বাণিজ্য ও পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি এর মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর উপায় নিয়েও কাজ করার নির্দেশনা দেন তিনি।
৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা
২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এ বিশাল লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব।
তিনি বলেন, লক্ষ্যমাত্রাটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও দেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে এনবিআর এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণে ১২ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ।
কর ফাঁকি রোধে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিভিন্ন খাতে নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানানো হয় সম্মেলনে।
রপ্তানি, খুচরা বিক্রয়, জুয়েলারি, সম্পত্তি হস্তান্তর ও লভ্যাংশ আয়ের মতো খাতকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। কর ফাঁকি শনাক্তে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ পদ্ধতি সম্প্রসারণ, অনিবাসী করদাতাদের তদারকি, বকেয়া কর আদায় এবং অডিট ও মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়।
ভ্যাট খাতে নতুন করদাতা শনাক্ত, করজাল সম্প্রসারণ এবং নিয়মিত রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সিগারেট ও তামাকজাত পণ্যে ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
শুল্ক খাতে যথাযথ মূল্যায়ন, দ্রুত পণ্য খালাস, বন্ডের অপব্যবহার বন্ধ এবং চোরাচালান প্রতিরোধেও জোর দেওয়া হবে।
কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর লক্ষ্য দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমান অবস্থার তুলনায় আরও বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। এজন্য অর্থনীতির অনানুষ্ঠানিক অংশকে ধীরে ধীরে কর ব্যবস্থার আওতায় আনার পাশাপাশি নতুন করদাতা শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে কর প্রশাসনকে এমন একটি আধুনিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করা, যেখানে প্রযুক্তি, তথ্য-উপাত্ত ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে কর সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।
সম্মেলনে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ইতিহাস ও প্রযুক্তির প্রদর্শনী
রাজস্ব সম্মেলনে বিভিন্ন স্টলে দেশের রাজস্ব আহরণের ইতিহাস, কাস্টমসের কার্যক্রম এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
- কাস্টমস, ল্যান্ডপোর্ট ও বিমানবন্দরে চোরাচালান প্রতিরোধে আটক বিভিন্ন পণ্য ও সোনা প্রদর্শন করা হয়। একই সঙ্গে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস ব্যবস্থার ঐতিহাসিক দলিল, পুরোনো মুদ্রা ও রাজস্ব আদায়ে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জামও প্রদর্শন করা হয়। এছাড়া ই-রিটার্ন, করসাথি, বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডোসহ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন সেবা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।
রাজস্ব সম্মেলনকে শুধু আনুষ্ঠানিক আয়োজন হিসেবে না দেখে মাঠপর্যায়ের বাস্তব সমস্যা ও ভবিষ্যৎ কর ব্যবস্থাপনার কৌশল নিয়ে সরাসরি মতবিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সম্মেলনে সারাদেশ থেকে আসা এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেন। বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন, মতবিনিময় ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী সম্মেলন শেষ হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রাজস্ব প্রশাসনে দীর্ঘদিনের জড়তা কাটিয়ে নতুন কর্মস্পৃহা তৈরি এবং ভবিষ্যৎ রাজস্ব আহরণে একটি সমন্বিত কৌশল নির্ধারণে এবারের সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।