যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েন, চীন-রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে ভারত
ঢাকা
মঙ্গলবার
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ইং
৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | তারারদেশ নিউজ:
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয়ে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যেই চীন, রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ আরও বাড়াচ্ছে নয়াদিল্লি। ফলে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতাকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে ছেড়ে চীন-রাশিয়ার দিকে ভারতের ঝুঁকে পড়া হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। বরং বিভিন্ন শক্তিধর দেশের সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার নীতিই অনুসরণ করছে ভারত—এমন চিত্র উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কেন দূরত্ব বাড়ছে
যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অবৈধ ভারতীয় অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো এবং তাদের হাতে হ্যান্ডকাফ পরানোর ছবি প্রকাশের পর ভারতে ব্যাপক সমালোচনা হয়। এর পাশাপাশি রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করায় দুই দেশের সম্পর্কেও চাপ তৈরি হয়েছে।
ভারত অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যেও রাশিয়া থেকে তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে। ভারত-পাকিস্তান সংঘাত বন্ধে ট্রাম্পের মধ্যস্থতার দাবিও নয়াদিল্লি স্বীকার করেনি। এসব বিষয় মোদী-ট্রাম্প সম্পর্কে অস্বস্তি বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকের চেষ্টা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েনের পাশাপাশি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ থাকলেও দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ পুনরায় চালু, বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ এবং শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠকের মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে মোদী ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকে সীমান্ত বিরোধের ন্যায্য ও উভয়ের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধানের বিষয়ে কাজ করার কথা হয়েছে। পাশাপাশি বাণিজ্য, সরবরাহব্যবস্থা, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং দুই দেশের যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
রাশিয়ার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা
রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অবশ্য দীর্ঘদিনের। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা চাপের মধ্যেও রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কিনেছে ভারত। ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ব্রিকস সম্মেলনেও মোদী ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে যোগাযোগ ছিল উল্লেখযোগ্য। পুতিন ব্রিকসকে আরও ন্যায্য বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরেছেন।
ইরানের সঙ্গেও যোগাযোগ অব্যাহত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘ সংঘাতের মধ্যেও তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখেছে নয়াদিল্লি। ব্রিকস বিজনেস ফোরামে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে মোদীর ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের একটি ছবি আলোচনায় আসে।
একদিকে ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক ধরে রাখা—ভারতের এই অবস্থান দেশটির বহুমুখী কূটনৈতিক কৌশলেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
‘বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব’-এর পক্ষে মোদী
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে মোদী সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আরও সহযোগিতার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিশ্বব্যবস্থায় গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর শুধু সদস্য হিসেবে উপস্থিতি নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণেও কার্যকর ভূমিকা থাকা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদসহ বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় সংস্কারের জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরির প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি। এতে ভারতের বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে।
তাহলে কি ট্রাম্পকে ছেড়ে দিচ্ছেন মোদী?
চীন, রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতা দেখে এমন প্রশ্ন উঠলেও এখনই ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে ছেড়ে চীন-রাশিয়ার শিবিরে যোগ দিচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
বরং নয়াদিল্লি একই সঙ্গে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করছে। বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও ইরানকে ঘিরে বিভাজন বাড়ার মধ্যে ভারতের এই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তারারদেশ নিউজ