পিতা-মাতার ভরণপোষণ সন্তানের ধর্মীয় আইনি নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল

মানুষের জীবনে এমন দুটি শব্দ রয়েছে, যার গভীরতা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সেই দুটি শব্দ হলো মা ও বাবা। পৃথিবীর সব সম্পর্কের মধ্যে এই সম্পর্কই সবচেয়ে পবিত্র, সবচেয়ে নিঃস্বার্থ এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। একজন সন্তান পৃথিবীতে আসার বহু আগে থেকেই তাঁর জন্য স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তাঁর পিতা-মাতা। একজন মা দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করেন, মৃত্যুযন্ত্রণার মতো কষ্ট সহ্য করে সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখান। জন্মের পর নিজের ক্ষুধা, ঘুম, স্বাচ্ছন্দ্য এবং ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াকে বিসর্জন দিয়ে সন্তানের লালন-পালনে নিজেকে উৎসর্গ করেন। অন্যদিকে একজন বাবা সংসারের হাজারো কষ্ট, দুশ্চিন্তা ও সংগ্রাম নিজের বুকে লুকিয়ে রেখে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন। তাঁদের কাছে নিজের সুখের চেয়ে সন্তানের সুখই বড়, নিজের ভবিষ্যতের চেয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎই অধিক মূল্যবান।

কিন্তু অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও সত্য, সেই পিতা-মাতাই আজ অনেক ক্ষেত্রে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। যাঁদের হাত ধরে একজন সন্তান হাঁটতে শিখেছে, কথা বলতে শিখেছে, জীবনের প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করেছে, সেই হাতই বার্ধক্যে এসে অনেক সময় অসহায়ভাবে সাহায্যের জন্য প্রসারিত থাকে। অথচ সেই হাত ধরার মতো সময় কিংবা মানসিকতা অনেক সন্তানের থাকে না। এটি কেবল একটি পারিবারিক সংকট নয়, বরং আমাদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধের গভীর অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি।

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে এক বৃদ্ধা মায়ের মৃত্যুর ঘটনা গোটা দেশকে ব্যথিত করেছে। চারজন সন্তান সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত থাকা সত্ত্বেও শেষ জীবনে তিনি যথাযথ যত্ন ও সেবার অভাবে মানবেতর জীবন কাটিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় তাঁর মরদেহ পড়ে থাকার খবর মানুষকে শুধু শোকাহত করেনি, বরং বিবেককে নাড়া দিয়েছে। ঘটনাটি আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে, আমরা কি সত্যিই আমাদের পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন করছি, নাকি শুধু সামাজিক পরিচয়ের আড়ালে নিজেদের দায়িত্বহীনতাকে লুকিয়ে রাখছি?

তবে এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবেগ সৃষ্টি করা নয়। বরং সেই ঘটনাকে উপলক্ষ করে একটি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরা। কারণ মিরপুরের সেই মা একা নন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার পিতা-মাতা আজ নীরবে একই কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছেন। কেউ অর্থের অভাবে নয়, সন্তানের ভালোবাসার অভাবে কষ্ট পাচ্ছেন। কেউ ওষুধের অভাবে নয়, একটি আন্তরিক খোঁজখবরের অভাবে নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছেন। তাঁদের আর্তনাদ সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না, কিন্তু প্রতিদিন অসংখ্য পরিবারে নীরবে এই মানবিক বিপর্যয় ঘটে চলেছে।

অনেকেই মনে করেন, পিতা-মাতার দেখাশোনা করা বা তাঁদের খরচ বহন করা সন্তানের দয়া বা অনুগ্রহ। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। পিতা-মাতার ভরণপোষণ কোনো দান নয়, এটি তাঁদের ন্যায্য অধিকার। সন্তান হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করা কোনো উপকার নয়, বরং একটি অপরিহার্য কর্তব্য। যে মা-বাবা নিজের সর্বস্ব দিয়ে সন্তানকে মানুষ করেছেন, তাঁদের বার্ধক্যে সম্মান, নিরাপত্তা, চিকিৎসা, খাদ্য, বাসস্থান এবং মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করা সন্তানের স্বাভাবিক দায়িত্ব। একজন বৃদ্ধ পিতা কিংবা মায়ের সবচেয়ে বড় চাহিদা সব সময় অর্থ নয়। তাঁরা চান সন্তান একটু পাশে বসুক, দুই মিনিট কথা বলুক, খোঁজ নিক, অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাক, প্রয়োজনে হাত ধরে হাঁটুক। এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যেখানে পিতা-মাতার মর্যাদাকে অত্যন্ত উচ্চ স্থানে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে নিজের ইবাদতের নির্দেশ দেওয়ার পরপরই পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে, একজন মানুষের ঈমান ও চরিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো পিতা-মাতার প্রতি তার আচরণ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার সঙ্গে উত্তম আচরণ করবে। তাঁদের একজন অথবা উভয়েই যদি বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাঁদের উদ্দেশে ‘উহ’ পর্যন্ত বলবে না, ধমক দেবে না বরং সম্মানের সঙ্গে কথা বলবে’। এই আয়াত শুধু ভদ্র আচরণের শিক্ষা দেয় না, বরং বার্ধক্যে পিতা-মাতার প্রতি অতিরিক্ত ধৈর্য, সহানুভূতি ও দায়িত্বশীলতার নির্দেশ দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত’।
আরেকটি হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যে’।
এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, পিতা-মাতার সেবা শুধু একটি সামাজিক কাজ নয়, এটি ইবাদত। তাঁদের ভরণপোষণ করা কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম মাধ্যম।

আজ আমাদের সমাজে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়েছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে আত্মকেন্দ্রিকতা, ভোগবাদ এবং পারিবারিক দূরত্ব। আমরা সন্তানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করছি, কিন্তু মানবিক শিক্ষা কতটা দিচ্ছি? আমরা সন্তানকে সফল হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছি, কিন্তু কৃতজ্ঞ হওয়ার শিক্ষা কি দিচ্ছি? আজকের শিশু যদি দেখে তার বাবা নিজের বৃদ্ধ বাবার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করছেন, তবে সেই শিশু বড় হয়ে একই আচরণ করবে। কারণ মূল্যবোধ মুখে শেখানো যায় না, তা শেখানো হয় আচরণের মাধ্যমে। যে পরিবারে পিতা-মাতাকে সম্মান করা হয়, সেই পরিবারে সন্তানরাও মানবিক হয়ে বেড়ে ওঠে। আর যেখানে বৃদ্ধ মা-বাবাকে অবহেলা করা হয়, সেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও একই অবক্ষয়ের ধারক হয়ে ওঠে। এই কারণেই পিতা-মাতার ভরণপোষণ কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি একটি জাতির নৈতিক শক্তির মানদণ্ড।

অনেকেই মনে করেন, পিতা-মাতার ভরণপোষণ সম্পূর্ণ পারিবারিক বিষয়। সন্তান চাইলে করবে, না চাইলে করবে না। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বাংলাদেশ রাষ্ট্রও পিতা-মাতার ভরণপোষণকে একটি মৌলিক পারিবারিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন করেছে। ২০১৩ সালে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ প্রণয়নের মাধ্যমে রাষ্ট্র স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, আর্থিকভাবে সক্ষম প্রত্যেক সন্তানের ওপর তাঁর পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করার আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য শুধু খাদ্য বা অর্থের ব্যবস্থা করা নয়, বরং প্রবীণ পিতা-মাতার জন্য সম্মানজনক, নিরাপদ ও মানবিক জীবন নিশ্চিত করা।
আইন অনুযায়ী সন্তানের দায়িত্ব হলো, পিতা-মাতার খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, তাঁদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া, কোনো অবস্থায় তাঁদের অসহায় অবস্থায় ফেলে না রাখা ও অন্য ভাই-বোনের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে নিজের কর্তব্য থেকে সরে না দাঁড়ানো। আইন প্রণয়ন করা হয়েছে বলেই সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, বিষয়টি এমন নয়। বরং আইনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যে দায়িত্ব অনেকের বিবেক থেকে হারিয়ে গেছে, রাষ্ট্র সেটিকে আইনের মাধ্যমে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে বাধ্য হয়েছে। একটি সভ্য সমাজে সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, যে দায়িত্ব ভালোবাসা থেকে পালন করার কথা, সেটি আইনের ভয় দেখিয়ে আদায় করতে হয়।

আদালত একজন সন্তানকে ভরণপোষণের টাকা দিতে বাধ্য করতে পারে। কিন্তু আদালত কি একজন মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা ফিরিয়ে দিতে পারে? আদালত রায় দিতে পারে, কিন্তু মায়ের কপালে সন্তানের স্নেহের হাত রাখতে পারে না। বিচারক শাস্তি দিতে পারেন, কিন্তু একজন বৃদ্ধ বাবার নিঃসঙ্গ বিকেলগুলো পূরণ করতে পারেন না। এই কারণেই আইন প্রয়োজন, কিন্তু আইনের চেয়েও বেশি প্রয়োজন বিবেক। যেখানে বিবেক জাগ্রত থাকে, সেখানে মামলা হয় না। আদালতের দরজায় কড়া নাড়তে হয় না। সেখানে সন্তান নিজেই বুঝে নেয়, মা-বাবার মুখের হাসিই তার সবচেয়ে বড় অর্জন।

একসময় আমাদের সমাজে যৌথ পরিবার ছিল। একই ছাদের নিচে দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-চাচি, ভাই-বোন সবাই একসঙ্গে বসবাস করতেন। প্রবীণরা ছিলেন পরিবারের অভিভাবক, সিদ্ধান্তদাতা ও আশীর্বাদস্বরূপ।
আজ সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পারমাণবিক পরিবার, কর্মব্যস্ত জীবন, ভোগবাদী মানসিকতা এবং আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাধারা অনেক পরিবারকে প্রবীণদের থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। অনেক বৃদ্ধ মা-বাবা সন্তানদের একই শহরে থেকেও মাসের পর মাস তাঁদের মুখ দেখতে পান না। কেউ কেউ সন্তানের বাড়িতে থেকেও নিজেকে অতিথি মনে করেন। আবার অনেকে সন্তানদের সংসারে নিজের উপস্থিতিকে বোঝা বলে ভাবতে শুরু করেন। এটি শুধু একটি সামাজিক পরিবর্তন নয়, এটি গভীর মানবিক সংকট।

বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। সব বৃদ্ধাশ্রম খারাপ নয়। এমন অনেক প্রবীণ আছেন যাঁদের কোনো সন্তান নেই বা যাঁরা বিশেষ পরিস্থিতিতে সেখানে আশ্রয় নেন। কিন্তু যখন সন্তান থাকা সত্ত্বেও একজন পিতা বা মাকে বৃদ্ধাশ্রমে দিন কাটাতে হয়, তখন সেটি শুধু একটি পারিবারিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি আমাদের সামাজিক ব্যর্থতার প্রতীক। একজন মা কি কখনো তাঁর সন্তানকে এতিমখানায় রেখে নিশ্চিন্তে জীবন কাটিয়েছিলেন? তাহলে একজন সন্তান কীভাবে নিজের জন্মদাতা পিতা-মাতাকে একাকীত্বের মধ্যে রেখে স্বস্তিতে থাকতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আইনের কাছে নয়, সমাজের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের কাছেও চাওয়া উচিত।

রাজধানীর মিরপুরে ঘটে যাওয়া বৃদ্ধা মায়ের মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু শিক্ষিত হলেই মানুষ হওয়া যায় না, শুধু প্রতিষ্ঠিত হলেই দায়িত্বশীল হওয়া যায় না। চারজন সন্তান সমাজে প্রতিষ্ঠিত। অথচ জন্মদাত্রী মা জীবনের শেষ সময়ে অবহেলার শিকার। এই ঘটনাটি আমাদের শেখায়, অর্থনৈতিক সাফল্য কখনোই মানবিকতার বিকল্প হতে পারে না। আমরা প্রায়ই সন্তানদের ভালো স্কুলে ভর্তি করাই, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠাই, বড় চাকরি পাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। কিন্তু তাঁদের কি শেখাই যে, বৃদ্ধ মা-বাবার হাত ধরে হাঁটানোও জীবনের একটি বড় দায়িত্ব? যে শিক্ষা মানুষকে কৃতজ্ঞ হতে শেখায় না, সে শিক্ষা অসম্পূর্ণ।
যে সাফল্য মানুষকে নিজের জন্মদাতার প্রতি দায়িত্বশীল করে না, সে সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ। মিরপুরের সেই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়, এটি আমাদের সময়ের একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি। আজ যদি আমরা এই ঘটনাকে শুধুই সংবাদ হিসেবে পড়ে ভুলে যাই, তাহলে আগামীকাল আরও অসংখ্য মা-বাবা একই পরিণতির শিকার হবেন।

আমরা অনেক সময় প্রতিবেশীর বাড়িতে বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি অবহেলা দেখতে পাই। আত্মীয়স্বজনের মধ্যেও এমন ঘটনা ঘটে। কিন্তু খুব কম মানুষই প্রতিবাদ করেন। এই নীরবতা অন্যায়কে আরও শক্তিশালী করে।পিতা-মাতার প্রতি নির্যাতন, অবহেলা বা ভরণপোষণ থেকে বঞ্চিত করা শুধু পারিবারিক বিষয় নয়, এটি একটি সামাজিক অন্যায়। অন্যায় দেখেও নীরব থাকা সমাজকে আরও নিষ্ঠুর করে তোলে। তাই পরিবার, আত্মীয়স্বজন, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। পিতা-মাতার অধিকার রক্ষায় সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা আজ সময়ের দাবি। আজ আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কেমন সমাজ রেখে যেতে চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে বৃদ্ধ মা-বাবা সন্তানের অপেক্ষায় জানালার পাশে বসে থাকবেন, নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে বার্ধক্য হবে সম্মান, নিরাপত্তা ও ভালোবাসার আরেকটি নাম?

পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু সন্তানের নয় বরং পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং প্রতিটি নাগরিকেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। একটি মানবিক সমাজ গড়তে হলে আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। পরিবার থেকেই মূল্যবোধের শিক্ষা শুরু করতে হবে। শিশুকে শুধু ভালো ফলাফল অর্জনের শিক্ষা দিলেই হবে না, তাকে কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতার শিক্ষাও দিতে হবে। সে যেন ছোটবেলা থেকেই বুঝতে শেখে, মা-বাবার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং এটি একজন মানুষের সর্বোচ্চ নৈতিক পরিচয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা আরও কার্যকর করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে পিতা-মাতার অধিকার, প্রবীণদের মর্যাদা এবং পারিবারিক দায়িত্ব নিয়ে বাস্তবধর্মী আলোচনা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। শুধু পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার শিক্ষা নয়, মানুষ হওয়ার শিক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা আরও জোরদার করতে হবে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডায় ধর্মীয় আলোচনায় নিয়মিতভাবে পিতা-মাতার অধিকার ও সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করা উচিত। ধর্ম কখনোই পিতা-মাতার অবহেলাকে সমর্থন করে না। রাষ্ট্রকে বিদ্যমান আইন আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা এখনও যথেষ্ট নয়। অনেক পিতা-মাতা জানেনই না যে, তাঁরা আইনগতভাবে ভরণপোষণ দাবি করার অধিকার রাখেন। তাই প্রচার-প্রচারণা, আইনি সহায়তা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রবীণদের অধিকার নিয়ে নিয়মিত প্রচারণা, সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং ইতিবাচক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। যে সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ কথা বলে, সেই সমাজেই পরিবর্তন আসে।

আপনি যদি আজ কর্মজীবনে সফল হন, সমাজে সম্মানিত হন, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হন, তাহলে একটু থেমে নিজেকে প্রশ্ন করুন। শেষ কবে মায়ের পাশে বসে গল্প করেছেন? শেষ কবে বাবার হাত ধরে হেঁটেছেন?
শেষ কবে তাঁদের চিকিৎসার খবর নিয়েছেন? শেষ কবে তাঁদের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছেন, ‘আপনারা আছেন বলেই আমি আজ এই অবস্থানে’। অনেক সময় আমরা মনে করি, টাকা পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ। বাস্তবতা হলো, বৃদ্ধ পিতা-মাতার সবচেয়ে বড় চাহিদা অর্থ নয়, সন্তানের সময়, ভালোবাসা, সম্মান এবং আন্তরিকতা।
একদিন যে মা আপনার হাত ধরে স্কুলে নিয়ে গেছেন, আজ তাঁর হাত কাঁপে। একদিন যে বাবা আপনাকে কাঁধে তুলে পথ চলেছেন, আজ তিনিই হয়তো সিঁড়ি ভাঙতে আপনার হাতের অপেক্ষায় থাকেন। জীবনের এই চক্রকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আজ আপনি সন্তান, কাল আপনিও পিতা বা মাতা হবেন। আজ আপনার মা-বাবার সঙ্গে আপনার আচরণই আগামী দিনে আপনার সন্তানের আচরণের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কোনো মা-বাবাকে নিজের সন্তানের কাছে অবহেলিত হতে হবে না। আমরা এমন একটি পরিবার চাই, যেখানে বার্ধক্যকে বোঝা নয়, অভিজ্ঞতার সম্পদ হিসেবে দেখা হবে। আমরা এমন একটি প্রজন্ম চাই, যারা প্রযুক্তিতে আধুনিক হওয়ার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধেও সমৃদ্ধ হবে। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে বৃদ্ধাশ্রম নয়, প্রতিটি সন্তানের ঘরই হবে পিতা-মাতার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।

পিতা-মাতা পৃথিবীতে আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় নিয়ামত। তাঁদের ঋণ কোনো দিন শোধ করা সম্ভব নয়। কারণ সন্তানের জন্য তাঁদের যে ত্যাগ, যে ভালোবাসা এবং যে আত্মনিবেদন, তার কোনো তুলনা হয় না। আজ যদি আমরা তাঁদের বার্ধক্যে পাশে না দাঁড়াই, তবে শুধু একজন মানুষ হিসেবে নয়, একজন সন্তান হিসেবেও আমরা ব্যর্থ হব। ধর্ম আমাদের এই দায়িত্ব দিয়েছে, আইন আমাদের বাধ্য করেছে, নৈতিকতা আমাদের আহ্বান জানিয়েছে এবং সমাজ আমাদের কাছে এই প্রত্যাশাই করে। মিরপুরের সেই মায়ের মৃত্যু আমাদের জন্য একটি নির্মম শিক্ষা। এই ঘটনা যেন আর কোনো পরিবারের ভাগ্যে না ঘটে। কোনো মা যেন সন্তানের অবহেলায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ না করেন। কোনো বাবা যেন নিজের সন্তানদের কাছে অবাঞ্ছিত হয়ে না বাঁচেন। আজ আমাদের প্রত্যেকের প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত, পিতা-মাতার ভরণপোষণকে দয়া বা অনুগ্রহ নয়, তাঁদের প্রাপ্য অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করব। মনে রাখতে হবে, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার সম্পদ, পদ বা ক্ষমতায় নয়, বরং সে তার বৃদ্ধ পিতা-মাতার সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তার মধ্যেই তার প্রকৃত মানবিক পরিচয় নিহিত থাকে।

একটি জাতির সভ্যতা পরিমাপ করা যায় না শুধু উন্নয়নের পরিসংখ্যান দিয়ে। সেই জাতির প্রকৃত সভ্যতা প্রতিফলিত হয় তার প্রবীণদের মুখের হাসিতে, তাদের নিরাপত্তায় এবং তাদের সম্মানজনক জীবনে। তাই আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনের ভয়ে নয়, ভালোবাসার টানে নিশ্চিত হবে, যেখানে কোনো মা সন্তানের অপেক্ষায় নিরাশ হবেন না, কোনো বাবা নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে হারিয়ে যাবেন না। কারণ পিতা-মাতার দোয়াই সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ, আর তাঁদের সন্তুষ্টিতেই সৃষ্টিকর্তা সন্তুষ্ট হয়। পিতা-মাতার ভরণপোষণ সন্তানের ধর্মীয়, আইনি, নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। একটি মানবিক, সুন্দর ও কল্যাণময় সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পিতা-মাতাসহ প্রবীণদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক পরিচিতি:
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটি
যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটি




বাংলা নববর্ষ উদযাপনে সেকালের আন্তরিকতা ও একালের আধুনিকতা– লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল

বাংলা নববর্ষ বাঙালির সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব। পহেলা বৈশাখ মানেই নতুন প্রেরণা, নতুনের সূচনা, নতুন আশা, পুরোনো গ্লানি ঝেড়ে ফেলে নতুন করে জীবনকে সাজানোর এক অনন্য উপলক্ষ। সময়ের প্রবাহে এই উৎসবের রূপ, আঙ্গিক ও উদযাপনের ধরনে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। সেকালের বৈশাখ ছিল সরল, গ্রামীণ এবং ঐতিহ্যনির্ভর, আর একালের বৈশাখ অনেকটাই নগরকেন্দ্রিক, বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিনির্ভর। এই পরিবর্তনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার বিবর্তনের গল্প।
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস গভীরভাবে জড়িত কৃষিভিত্তিক সমাজের সঙ্গে। সম্রাট আকবরের সময় রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সনের প্রচলন হলেও, তা ধীরে ধীরে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। সেকালে নববর্ষ ছিল মূলত কৃষকের উৎসব। বছরের ফসল ঘরে তোলার পর নতুন বছরের শুরুতে জমির হিসাব-নিকাশ, পাওনা-দেনা মিটিয়ে নতুন খাতা খোলার রীতি ছিল।
গ্রামবাংলায় নববর্ষ মানেই ছিল মেলা, পান্তা-ইলিশ, লোকসংগীত, পালাগান, যাত্রাপালা এবং গ্রামীণ খেলাধুলা। সকালবেলায় সবাই নতুন পোশাক পরে, বিশেষ করে সাদা-লাল শাড়ি ও পাঞ্জাবি পরে বৈশাখী মেলায় বা আয়োজিত নানা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন। অনেক জায়গায় বৈশাখী মেলা বসত, যেখানে থাকত হস্তশিল্প, মাটির জিনিস, নকশিকাঁথা, বাঁশের তৈরি সামগ্রী। এই মেলাগুলো ছিল গ্রামীণ অর্থনীতিরও একটি বড় অংশ।
হালখাতা ছিল নববর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ব্যবসায়ীরা তাদের পুরোনো হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খুলতেন। গ্রাহকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টিমুখ করানো হতো। এতে ব্যবসায়ী ও ক্রেতার মধ্যে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হতো।
সেকালের বৈশাখে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। উৎসব ছিল মানুষের অন্তর থেকে উঠে আসা এক আনন্দের প্রকাশ। সেখানে সামাজিক বন্ধন ছিল দৃঢ়, পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল আন্তরিক।
বর্তমান সময়ে বাংলা নববর্ষের উদযাপন অনেকটাই বদলে গেছে। শহরকেন্দ্রিক জীবন, প্রযুক্তির প্রসার এবং বিশ্বায়নের প্রভাবে এই উৎসবের আঙ্গিকেও এসেছে নতুন মাত্রা। এখন পহেলা বৈশাখ শুধু গ্রামেই নয়, শহরের প্রতিটি কোণায় উদযাপিত হয় জাঁকজমকপূর্ণভাবে।
ভোরবেলা সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আয়োজন করে গান, নৃত্য, কবিতা আবৃত্তি। “এসো হে বৈশাখ” গানের মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করা এখন এক প্রচলিত রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগরজীবনে এটি এক প্রকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
বাঙালির জীবনে বাংলা নববর্ষ একটি সচেতন প্রতিফলন। প্রত্যেক জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি প্রভাব বিস্তার করে একটা সুস্থ ও সচেতন মানসগঠনের দায়িত্ব নেয়। সংস্কৃতির মধ্যে অবগাহন করেই মানুষ নিজের ব্যক্তিত্বের স্পষ্ট একটি রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করে। নিজের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা যে কোনো জাতিকে বড় হওয়ার প্রাথমিক দীক্ষা দেয়।
একালের বৈশাখের একটি বড় দিক হলো শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে প্রতিবছর বাংলা নববর্ষে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বের করা হতো, ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে জাতিসংঘের ইউনেসকো গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু গত বছর পহেলা বৈশাখে চারুকলা থেকে বের হওয়া শোভাযাত্রার নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’।
এই শোভাযাত্রা এবছর থেকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে হবে বলে গত ৫ এপ্রিল (রবিবার) জানিয়েছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রার নাম নিয়ে যে বিতর্ক, আমরা তার অবসান চাই। এখন থেকে নববর্ষের শোভাযাত্রা ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে অনুষ্ঠিত হবে।’
তিনি বলেন, ‘পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণসহ অন্যান্য সকল আয়োজন থাকবে। চারুকলা থেকে যে শোভাযাত্রা বের হয়, তার যে যে বৈশিষ্ট্য আছে, সবই থাকবে।’ বিভিন্ন মুখোশ, প্রতীকী ভাস্কর্য, প্রাণীর প্রতিরূপ সব মিলিয়ে এটি এক শিল্পসম্মত প্রতিবাদের ভাষা, যেখানে সমাজের নানা অসঙ্গতির প্রতিফলন দেখা যায়।
তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসেছে বাণিজ্যিকীকরণের ছোঁয়াও। পহেলা বৈশাখ এখন অনেকটাই ব্যবসার একটি বড় সুযোগ হয়ে উঠেছে। ফ্যাশন হাউজগুলো নতুন ডিজাইনের পোশাক বাজারে আনে, রেস্টুরেন্টগুলো বিশেষ খাবারের আয়োজন করে, বিভিন্ন ব্র্যান্ড অফার ও প্রচারণা চালায়। ফলে নববর্ষ উদযাপনের একটি বড় অংশ আজ ভোক্তাবাদী প্রবণতার দিকে ঝুঁকছে, যেখানে সাংস্কৃতিক চেতনার পরিবর্তে কেনাকাটা ও বাহ্যিক প্রদর্শনই মুখ্য হয়ে উঠছে।
সেকালে নববর্ষের খাবার ছিল মূলত ঘরোয়া ও সহজ। পান্তা ভাত, শুঁটকি, শাকসবজি, ডাল, ইলিশ মাছ ছিল প্রধান আকর্ষণ। এই খাবারের সঙ্গে ছিল একটি গ্রামীণ স্বাদ ও ঐতিহ্যের ছোঁয়া।
এখনো পান্তা-ইলিশ নববর্ষের প্রতীক হিসেবে রয়েছে, তবে তা অনেকটাই রেস্টুরেন্টকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। অনেকেই বাইরে গিয়ে বিশেষ প্যাকেজে এই খাবার উপভোগ করেন। ফলে ঘরের ভেতরের আন্তরিক আয়োজন অনেক ক্ষেত্রে কমে এসেছে।
সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও এসেছে পরিবর্তন। আগে লোকসংগীত, বাউল গান, পালাগান ছিল প্রধান আকর্ষণ। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যান্ড সংগীত, আধুনিক গান, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে লাইভ অনুষ্ঠান ইত্যাদি।
একালের বৈশাখ প্রযুক্তির প্রভাবে আরও বিস্তৃত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় এখন খুবই সাধারণ বিষয়। অনলাইনে আয়োজন করা হচ্ছে ভার্চুয়াল অনুষ্ঠান, লাইভ কনসার্ট। প্রবাসী বাঙালিরাও এখন সহজেই এই উৎসবে অংশ নিতে পারছেন।
তবে প্রযুক্তির এই অগ্রগতি যেমন সুবিধা এনে দিয়েছে, তেমনি কিছুটা দূরত্বও তৈরি করেছে। আগে যেখানে মানুষ সরাসরি মিলিত হতো, এখন অনেক ক্ষেত্রেই তা সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে ভার্চুয়াল যোগাযোগে।
সেকালের বৈশাখ ছিল সামাজিক সংহতির এক শক্ত ভিত্তি। সবাই মিলে উৎসব পালন করত, ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ছিল কম। গ্রামের সবাই একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করত।
একালের বৈশাখে এই সংহতি কিছুটা হলেও কমেছে। শহুরে জীবনে মানুষ অনেকটাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। উৎসব এখন অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
তবে ইতিবাচক দিকও আছে। এখন নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই উৎসবে যুক্ত হচ্ছে। এটি একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, যা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে একত্রিত করে।
সেকালে উৎসব ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও নিরাপদ। জনসমাগম তুলনামূলক কম ছিল, তাই নিরাপত্তা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করতে হতো না।
বর্তমানে বিশাল জনসমাগমের কারণে নিরাপত্তা একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনকে নিতে হয় বিশেষ ব্যবস্থা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকতে হয়, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে মূল্যবোধে। সেকালে নববর্ষ ছিল আত্মশুদ্ধির একটি উপলক্ষ। মানুষ নতুন বছরে ভালো কাজ করার সংকল্প নিত, পুরোনো ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করত।
এখন সেই দিকটি কিছুটা হলেও আড়ালে পড়ে গেছে। উৎসব অনেক ক্ষেত্রে বাহ্যিক চাকচিক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। তবে এখনও অনেকেই এই দিনটিকে আত্মসমালোচনা ও নতুন সূচনার দিন হিসেবে দেখেন।
বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই উৎসবের ঐতিহ্য ধরে রাখা। বিশ্বায়নের প্রভাবে অনেক বিদেশি সংস্কৃতি আমাদের জীবনে প্রবেশ করছে, যা স্বাভাবিক। কিন্তু এর মধ্যে নিজের সংস্কৃতিকে ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলা নববর্ষ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালি জাতিসত্ত্বার পরিচয়ের অংশ। তাই এর মূল চেতনা মানবিক মর্যাদা, সমধিকার, ন্যায্যতা-এই মূল্যবোধগুলোকে ধরে রাখা প্রয়োজন।
সেকাল ও একালের বাংলা নববর্ষের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও মূল সুর একই, নতুনকে বরণ করা, পুরোনোকে বিদায় জানানো। সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন আসবেই, সেটিই স্বাভাবিক। তবে সেই পরিবর্তনের ভেতরেও আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মূল ভিত্তিকে অটুট রাখতে হবে।
বাংলা নববর্ষ যেন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে ওঠে, বরং এটি হোক আত্মপরিচয়ের উৎস, সামাজিক বন্ধনের সেতুবন্ধন এবং মানবিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণের দিন। তাহলেই সেকালের সেই আন্তরিকতা ও একালের আধুনিকতার সমন্বয়ে আমরা গড়ে তুলতে পারব একটি সমৃদ্ধ ও মানবিক সমাজ।
নতুন বছর আমাদের জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ-শান্তি, সমৃদ্ধি ও সৌহার্দ্য। নববর্ষ ১৪৩৩ সবার জন্য হোক আনন্দময়, কল্যাণময় ও মঙ্গলময়।

লেখক পরিচিত:
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটি
যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটি




নববর্ষ ১৪৩৩ সবার জন্য হোক মঙ্গলময়—- লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল

বাঙালির সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব বাংলা নববর্ষ। পয়লা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ, চৈত্রের শেষ বৈশাখের শুরু। এই শেষ চৈত্র আর পয়লা বৈশাখ নিয়ে যে উৎসবের আয়োজন, তা বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি। বাঙালির নতুন বছরের প্রথম দিন। মোগল সম্রাট আকবর তার শাসনামলে ফসলের খাজনা তোলার সুবিধার্থে বাংলা বছরের হিসাব শুরু করেন। সেই থেকে বাংলা নববর্ষবরণ শুরু হয়। পয়লা বৈশাখ ধর্মবর্ণ ভেদাভেদ ভুলে সব সম্প্রদায়ের এক মিলনের স্মারক।
বাঙালি জাতি সারাটা বছর অধীর আগ্রহে এই দিনের জন্য অপেক্ষা করে। পয়লা বৈশাখ প্রকৃতির নিয়মে ঘুরে আসে। এ বছর বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ নানা আয়োজনে বরণ করা হচ্ছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজকেরা ডিজিটাল মাধ্যমে বর্ষবরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। উল্লেখ্য, ১৯৬৭ সাল থেকে নিয়মিত সূর্যোদয় থেকে রমনার বটমূলে পয়লা বৈশাখের প্রভাতি সংগীতায়োজন করে আসছে ছায়ানট। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালে এবং করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে রমনার বটমূলে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। এ বছর সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার রমনার বটমূলে নানা আয়োজনে বাংলা নববর্ষকে বরণ করা হবে। এছাড়া দেশের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন আয়োজনে বর্ষবরণ হবে। নববর্ষ উৎসবে নানা আয়োজন দেশ-বিদেশে মানুষের জীবনকে নানাভাবে উজ্জীবিত ও আন্দোলিত করে। উৎসব আয়োজনে থাকে বৈশাখী মেলা, মঙ্গল শোভাযাত্রা, পুতুলনাচ, জারিসারি, গানের আসর, লাঠিখেলা, নানা রকম পিঠাপুলির আয়োজন, অনেক স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তাভাত খাওয়ার আয়োজন করা হয়। এসব আনুষ্ঠানিকতা বাঙালিকে বিশ্বদরবারে পরিচিত ও সমৃদ্ধ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে প্রতিবছর বাংলা নববর্ষে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বের করা হয়, ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে জাতিসংঘের ইউনেসকো গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু গত বছর পহেলা বৈশাখে চারুকলা থেকে বের হওয়া শোভাযাত্রার নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। তার আগে এটি ছিল ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।
এই শোভাযাত্রা এখন থেকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে হবে বলে গত ৫ এপ্রিল (রবিবার) জানিয়েছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রার নাম নিয়ে যে বিতর্ক, আমরা তার অবসান চাই। এখন থেকে নববর্ষের শোভাযাত্রা ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে অনুষ্ঠিত হবে।’
তিনি বলেন, ‘পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণসহ অন্যান্য সকল আয়োজন থাকবে। চারুকলা থেকে যে শোভাযাত্রা বের হয়, তার যে যে বৈশিষ্ট্য আছে, সবই থাকবে।’
বাঙালির জীবনে বাংলা নববর্ষ একটি সচেতন প্রতিফলন। প্রত্যেক জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি প্রভাব বিস্তার করে একটা সুস্থ ও সচেতন মানসগঠনের দায়িত্ব নেয়। সংস্কৃতির মধ্যে অবগাহন করেই মানুষ নিজের ব্যক্তিত্বের স্পষ্ট একটি রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করে। নিজের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা যে কোনো জাতিকে বড় হওয়ার প্রাথমিক দীক্ষা দেয়।
মূলত বাংলা নববর্ষ উদযাপনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি তার নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে থাকে। বাংলা নববর্ষের সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। সচেতন জাতির পরিচয় প্রকাশিত হয় বিচিত্র সাংস্কৃতিক রূপের মধ্য দিয়ে। বাংলা নববর্ষ বাঙালি সংস্কৃতির সেই পরিচয়বাহী। নববর্ষ মানুষকে সচেতন করে তার সাংস্কৃতিক চেতনার স্পন্দনে। জাতীয় জীবনে বর্ষবরণের প্রথম দিনে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর অর্থ নতুনকে বরণের সাগ্রহ মনোভাব। বাঙালি একটি ভাষাভিত্তিক জাতি। যাদের জন্ম বঙ্গে, মাতৃভাষা বাংলা, মূলত তারাই বাঙালি। এই বাঙালির বড় উৎসব বাংলা নববর্ষ। বিগত বছরের দুঃখ, বেদনা, আনন্দ, উৎসবের স্মৃতিচারণ পরিহার করে নতুন বর্ষকে স্বাগত জানানো হয়। বৈশাখে উৎসবে মানুষের ঢল নামে। মেলা বসে গ্রামে গ্রামে। নানা ধরনের হাতের তৈরি দ্রব্য ও খাবারের মেলা যেন গ্রামবাংলার মানুষের প্রতিচ্ছবি। তাদের জীবন যেন খণ্ড খণ্ড হয়ে ধরা পড়ে তাদের হাতের কারুকাজে। মাটির পুতুল, পাটের শিখা, তালপাতার পাখা, সোলার পাখি, বাঁশের বাঁশি, ঝিনুকের ঝাড়, পুঁতিমালা, কত না অদ্ভুত সব জিনিসের সমাবেশ ঘটে সেই মেলায়। চোখে না দেখলে যেন বিশ্বাসই হয় না বাংলার মানুষের জীবন এত সমৃদ্ধশালী। বাংলার মানুষ গরিব হতে পারে, দারিদ্র্যের নিষ্পেষণে তারা জর্জরিত হতে পারে; কিন্তু এসব দুঃখকষ্ট তাদের জীবনকে আনন্দ থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। নববর্ষ বছরটির জন্য আশার বাণী বহন করে নিয়ে আসে। তাই নববর্ষ আমাদের প্রাণে জাগায় আশার আলো ও উদ্দীপনা।
এজন্য আমাদের কাছে পয়লা বৈশাখ, পারসিকদের কাছে নওরোজ এবং ইংরেজদের কাছে ঐধঢ়ঢ়ু ঘবি ণবধৎ বিশেষ আনন্দময় দিবস। বাঙালি জীবনে যেমন ছিল পুণ্যাহ অনুষ্ঠান, তেমনি হালখাতা অনুষ্ঠান। জমিদারি প্রথা বাতিলের সঙ্গে পুণ্যাহ অনুষ্ঠান বিলুপ্ত হয়েছে; কিন্তু হালখাতা অনুষ্ঠান সগৌরবে বিরাজমান। নানা ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানে উদযাপিত হয় হালখাতা উৎসব। বিগত বছরের ধারদেনা শোধের পর্ব শুরু হয় এই দিনে। এর মধ্যে শুধু ব্যাবসায়িক লেনদেন নয়, হৃদয়ের বিনিময়ও ঘটে। ব্যবসায়িক লেনদেনের মধ্য দিয়ে পয়লা বৈশাখে মানুষে মানুষে সৌহার্দ বাড়ে। আজকাল পয়লা বৈশাখ উদযাপনের মধ্যে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে, বিশেষ করে নাগরিক জীবনে। শহরে শহরে মুক্তাঙ্গনে কবিতাপাঠ, আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রভৃতি কর্মসূচি পালন করা হয়। ঢাকায় রমনার বটমূলে এই অনুষ্ঠান বিশেষ ব্যাপকতা লাভ করেছে। শুধু নাচগানই নয়, বাঙালির বহুকালের অভ্যাস পান্তাভাত ও ইলিশ ভাজা খাওয়া এখানে চালু আছে বহু বছর ধরে। বৈশাখের তথা বাংলা নববর্ষের চেতনা বাঙালির হৃদয়ে অন্তরে মিশে আছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, বাংলা নববর্ষের ব্যাবহারিক প্রয়োগ আমাদের জীবনে প্রায় অনুপস্থিত। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বাংলা সন কিংবা বাংলা তারিখের ব্যবহার নেই বললেই চলে। বিদ্যালয়, অফিস-আদালত, ব্যাংক-বিমা, বিদেশভ্রমণের তারিখ নির্ধারণ ইত্যাদি কোনো পর্যায়েই বাংলা তারিখ ব্যবহৃত হয় না। পৃথিবীর বুকে একমাত্র যে দেশের মানুষ তাদের ভাষা রক্ষার জন্য আন্দোলন করে জীবন দিয়েছে, যে দেশে প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ পালিত হয় জমজমাট পরিবেশে, আনন্দঘন উৎসবে, সে দেশেই বাংলা সন ও বাংলা তারিখ উপেক্ষিত! এই অবস্থায় পয়লা বৈশাখের চেতনা তথা বাঙালির সংস্কৃতি ও বাংলা সন-তারিখ আদালতসহ দেশের সর্বত্র চালু করা প্রয়োজন। সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ও বাংলা তারিখ ব্যবহার করা অপরিহার্য।
নববর্ষ নতুন নতুন বার্তা নিয়ে ফিরে আসে। পূর্বের ভুলভ্রান্তি, গ্লানি, পঙ্কিলতা, নানা অনাচার ধুয়েমুছে সুন্দর, সত্য ও কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসবে এবারের বৈশাখ, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ সবার জন্য হোক কল্যাণময়, আনন্দময় ও মঙ্গলময়।

লেখক পরিচিত:
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি (কৃষি) কেন্দ্রীয় কমিটি
যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটি




সড়ক দখলমুক্ত করতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন– লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল

সড়ক ও মহাসড়কের উভয়পাশে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী হাট-বাজার, দোকানপাট এবং নানাধরনের অবৈধ স্থাপনা। ফলে প্রতিদিন বাড়ছে যানজট, দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগ। সড়ক ব্যবস্থাপনার এই অরাজকতা এখন জাতীয় সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে, যা দ্রুত সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। উল্লেখ্য যে, দেশের মহাসড়কগুলো সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) অধিগ্রহণকৃত জমির ওপর অবস্থিত। কিন্তু সড়কের দুইপাশে সওজ-এর জায়গায় বাজার বসিয়ে খাজনা আদায় করা হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে সরকারের স্থানীয় প্রশাসন তাদের নিজস্ব জায়গা না থাকা সত্ত্বেও সওজ-এর অনুমতি ব্যতীত হাট-বাজার ইজারা দিচ্ছে। ফলে এসকল এলাকায় সড়কে বা মহাসড়কে অনেকসময় প্রায় সারাদিন যানজট লেগে থাকে। যানজট কখনো কখনো কয়েক কিলোমিটার এলাকা ছাড়িয়ে যায়। ফলে যাত্রী সাধারণের দুর্ভোগ-দুর্গতি চরম আকার ধারণ করে। সম্প্রতি গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম রফিকুল ইসলাম সড়কের জায়গায় অস্থায়ী বাজারের ইজারা কার্যক্রম স্থগিত/বাতিল করার জন্যে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার বরাবর পত্র প্রেরণ করেছেন। এই পত্রে তিনি উল্লেখ করেন, ঢাকা-জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ জাতীয় মহাসড়কের উভয়পাশে সওজ অধিগ্রহণকৃত জায়গায় অস্থায়ী বাজার স্থাপনের ফলে যানজটের কারণে যাত্রী সাধারণের দুর্ভোগ ছাড়াও শিল্প কারখানার উৎপাদিত রপ্তানিমুখী পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটে। এতে শিল্প-কারখানার মালিকগণ সঠিক সময়ে রপ্তানিমুখী পণ্য পরিবহন করতে না পারায় কার্যাদেশ বাতিল হয়ে যেমন ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তেমনি মহাসড়কে চলাচলকারীগণের কর্মঘন্টা মহাসড়কেই নষ্ট হচ্ছে। তিনি সড়ক বা মহাসড়কের জায়গায় অস্থায়ী বাজারের ইজারা কার্যক্রম বাতিল বা স্থগিত করার জন্যে যে আহবান করেছেন, তা খুবই যুক্তিসংগত ও প্রশংসনীয়। দেশজুড়ে সড়ক ও মহাসড়কে প্রায় একই অবস্থা বিদ্যমান রয়েছে। ফলে সড়ক ও মহাসড়কের জায়গায় অস্থায়ী হাট-বাজার, গণশৌচাগারসমূহ ইজারা দেয়া নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে জাতীয়ভাবে সরকারের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। বর্তমানে সড়ক ও মহাসড়কের জায়গায় ইজারা চলমান থাকলে তা বাতিল করা আবশ্যক। সড়ক-মহাসড়কের উপরিস্থিত হাট-বাজারসহ সকল অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করার জন্যে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা এমনকি গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত একই চিত্র দেখা যায়। গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে কিংবা অনেক সময় সরাসরি সড়কের ওপর বসে যায় হাট-বাজার। সকালে সবজি বাজার, বিকেলে মাছের বাজার, আবার সন্ধ্যায় ভ্রাম্যমাণ দোকান একই জায়গা দিনে কয়েকবার ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের বেশিরভাগই অনুমোদনবিহীন।
ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো এখন যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। পথচারীদের জন্য নির্ধারিত জায়গা সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে সড়কে নেমে হাঁটে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অনেক জায়গায় সড়কের পাশে স্থায়ী দোকানপাট, গ্যারেজ, ওয়ার্কশপ এমনকি নির্মাণ সামগ্রী ফেলে রাখা হয়, যা যান চলাচলে বড় বাধা সৃষ্টি করে।

অবৈধ হাট-বাজার ও স্থাপনার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সড়কের ওপর, ফলে সৃষ্টি হয় যানজটের। যেখানে সড়ক দুই লেন থাকার কথা, সেখানে এক লেন কার্যত দখল হয়ে যায়। ফলে যানবাহনের গতি কমে যায়, সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী সবারই মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। একটি জরিপ অনুযায়ী, বড় শহরগুলোতে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা শুধু যানজটে নষ্ট হয়, যার একটি বড় কারণ সড়ক দখল। এর ফলে উৎপাদনশীলতা কমে যায়, অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। জ্বালানি খরচ বাড়ে, পরিবেশ দূষণ বৃদ্ধি পায়।

সড়কে অবৈধ স্থাপনা ও বাজার বসার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। হঠাৎ করে রাস্তার মাঝখানে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়, পার্ক করা যানবাহন, কিংবা এলোমেলোভাবে চলাচল এসব কারণে চালকদের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাতের বেলায় আলো স্বল্পতা এবং অনিয়ন্ত্রিত অবস্থার কারণে দুর্ঘটনার সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। পথচারীরা সঠিকভাবে রাস্তা পার হতে পারে না, যানবাহনগুলোও নির্দিষ্ট লেনে চলতে পারে না। ফলে প্রায়ই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

সড়কের ওপর হাট-বাজার বসার কারণে শুধু যানজটই নয়, জনস্বাস্থ্য সমস্যাও তৈরি হচ্ছে। খোলা জায়গায় অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাদ্যপণ্য বিক্রি হওয়ায় তা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে সড়কের পাশে ময়লা জমে থাকে, যা দুর্গন্ধ ও রোগবালাইয়ের কারণ হয়। এছাড়া যানজটের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকায় বায়ুদূষণ বাড়ে। ধোঁয়া, শব্দদূষণ এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধি সব মিলিয়ে নগরজীবন হয়ে উঠছে আরও কষ্টকর।

এই সমস্যার পেছনে অন্যতম বড় কারণ প্রশাসনিক দুর্বলতা। আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। অনেক সময় স্থানীয় প্রভাবশালী মহল কিংবা অসাধু সিন্ডিকেটের কারণে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও বড় সমস্যা। সড়ক বিভাগ, সিটি করপোরেশন, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন সবাই আলাদাভাবে কাজ করলেও সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জীবিকা। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জীবিকার তাগিদে সড়কে দোকান বসান। তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে এই পথ বেছে নেয়। তাই শুধুমাত্র উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ করলে তারা আবার অন্য কোথাও গিয়ে একই কাজ শুরু করবে। ফলে সমস্যাটি ঘুরেফিরে একই জায়গায় থেকে যাবে।

যখনই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়, তখন কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু কিছুদিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এর কারণ নিয়মিত মনিটরিংয়ের অভাব এবং কঠোর শাস্তির অনুপস্থিতি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিযান শেষে আবার একই জায়গায় দোকান বসে যায়। এতে বোঝা যায়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক প্রয়োগ ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।

এই জটিল সমস্যার সমাধানে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি:
সড়কের পাশে বসা হাট-বাজারগুলোকে নির্দিষ্ট জায়গায় স্থানান্তর করতে হবে। আধুনিক ও পরিকল্পিত বাজার গড়ে তুলে ব্যবসায়ীদের সেখানে স্থান দিতে হবে। অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে এবং পুনরায় দখল করলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে একসাথে কাজ করতে হবে। একটি কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্স গঠন করে নিয়মিত তদারকি করা যেতে পারে। সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে যে সড়ক দখল শুধু ব্যক্তিগত সুবিধা নয়, এটি সবার জন্য ক্ষতিকর। গণমাধ্যম ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। সিসিটিভি ক্যামেরা ও ডিজিটাল মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সড়কের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। এতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ শর্তে দোকান বরাদ্দ বা বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা সড়ক দখল করতে বাধ্য না হয়।

সরকার চাইলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর অবস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ইতোমধ্যে বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা।

শুধু সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে চলবে না। নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। অবৈধভাবে সড়কে দোকান বসানো কিংবা ফুটপাত দখল করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ক্রেতাদেরও সচেতন হতে হবে সড়কে বসা দোকান থেকে কেনাকাটা না করলে এই প্রবণতা অনেকটাই কমে যাবে।
সড়ক কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি সবার জন্য। কিন্তু অব্যবস্থাপনা, অবৈধ দখল এবং উদাসীনতার কারণে সড়ক আজ দুর্ভোগের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। হাট-বাজার ও অবৈধ স্থাপনার কারণে যে দুর্দশা সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। সমন্বিত উদ্যোগ, কঠোর আইন প্রয়োগ, বিকল্প ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা এই চারটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠতে পারে একটি নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক সড়ক ব্যবস্থা। অন্যথায়, এই দুর্ভোগ আরও বাড়বে এবং এর খেসারত দিতে হবে পুরো জাতিকেই। সড়কের শৃঙ্খলা ও সুষ্ঠু চলাচল ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ট্র্যাফিক আইন মেনে চলাসহ সবার সদিচ্ছা, কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

লেখক পরিচিত:
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল
(শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক)
যুগ্মমহাসচিব, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কেন্দ্রীয় কমিটি




দুঃসাহসী শহীদ লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল !

রোববার,
১৪ বৈশাখ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ,
২৭ এপ্রিল ২০২৫ ইং,

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. বায়েজিদ সরোয়ার, এনডিসি (অব.):

ডেটলাইন ২৭ জুন ১৯৭৫। স্বর্গীয় মাধুরীতে ভরা ইংল্যান্ডে এখন গ্রীষ্মকাল। প্রকৃতিতে সৌন্দর্যের বন্যা বইছে। কিন্তু এর চেয়েও আনন্দের বন্যা আজ ব্রিটেনের রয়াল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্টের ক্যাডেটদের মনে-প্রাণে। ছয় মাস কঠোর প্রশিক্ষণের পর আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রার্থিত সভরিন (পার্সিং আউট) প্যারেড। আজ প্যারেড রিভিউ করছেন রাজকুমারী এলিস। বিদেশি ক্যাডেটদের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে কমিশন লাভ করতে যাচ্ছেন তিনজন গর্বিত তরুণ। তাঁদের দুজন হলেন অফিসার ক্যাডেট আলাউদ্দিন মো. আবদুল ওয়াদুদ ও মাসুদুল হাসান। তৃতীয় তরুণের নাম শেখ জামাল। তিনি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুুুর রহমানের দ্বিতীয় পুত্র। ১ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে স্যান্ডহার্স্টের রেগুলার ক্যারিয়ার কোর্স শুরু হবে। শেখ জামাল এই প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও অংশ নিচ্ছেন না। কারণ তাঁর দুই প্রিয় বন্ধু বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছেন। আর রয়েছে মায়ের জন্য গভীর টান। মাত্র দেড় মাস পর এই সিদ্ধান্তই তাঁর জীবনকে তছনছ করে দেবে।

প্যারেডের শেষ পর্যায়ে অর্কেস্ট্রায় স্কটিশ বিদায় সংগীত ‘ওল্ড লং সিনস’-এর (পুরনো সেই দিনের কথা) সুর বেজে উঠেছে। ক্যাডেটরা সারিবদ্ধভাবে প্যারেড গ্রাউন্ড থেকে মার্চ করে ওল্ড কলেজের সিঁড়ি অতিক্রম করলেন। এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের তিন তরুণের ক্যাডেট থেকে কাঙ্ক্ষিত আর্মি অফিসারে রূপান্তর ঘটল। জামালের চোখে এখন আনন্দের অশ্রু। আনমনে ভাবলেন, ‘আব্বা যদি আজ প্যারেডে থাকতেন!’ ব্রিটিশ পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশের কমিশনপ্রাপ্ত তিন তরুণের ছবি ছাপা হলো। ছবিটি বিশ্বকে এক প্রতীকী বার্তা দিয়েছিল। লাখো প্রাণের বিনিময়ে সদ্যঃপ্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ তার সামরিক বাহিনীকে আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তুলতে চায়।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য কিশোর শেখ জামাল ১৯৭১ সালের ৫ আগস্ট ধানমণ্ডির তারকাঁটার বেড়া দেওয়া পাকিস্তানি বাহিনীর বন্দিশিবির থেকে পালিয়ে ভারতে যান। ধানমণ্ডি থেকে পালিয়ে ভারতের আগরতলা পৌঁছানো ছিল রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ পথচলা। আগরতলা থেকে কলকাতা হয়ে শেখ জামাল পৌঁছলেন ভারতের উত্তর প্রদেশের কালশীতে। মুজিব বাহিনীর (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স) ৮০ জন নির্বাচিত তরুণের সঙ্গে শেখ জামাল ২১ দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

প্রশিক্ষণ সমাপ্তির পর শেখ জামাল ৯ নম্বর সেক্টরে যোগদান করেন। ধানমণ্ডির বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে শেখ জামালের কক্ষে দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে (সাতক্ষীরার) কালীগঞ্জ রণাঙ্গনে তোলা রাইফেল কাঁধে শেখ জামালের মুক্তিযুদ্ধকালীন একটি ছবি। ৯ নম্বর সেক্টরের ডেয়ার ডেভিল মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মাহফুজ আলম বেগের স্মৃতিতে এখনো সমুজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলো: ইছামতী নদী, হিংগলগঞ্জ ক্যাম্প, পারুলিয়া ব্রিজ, রণাঙ্গনে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা শেখ জামাল, ক্যাম্পে বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাসেরের উদ্দীপনামূলক ভাষণ…। দেশ স্বাধীন হলে যুদ্ধের পোশাকেই যুদ্ধের ফ্রন্ট থেকে শেখ জামাল ঢাকায় ফেরেন ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর।

২৯ জানুয়ারি ১৯৭৪। ঢাকায় রাষ্ট্রীয় সফরে এসেছেন যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো। শেখ জামালের মধ্যে সেনাবাহিনীতে যোগদানের প্রবল আগ্রহ দেখে মার্শাল টিটো তাঁকে যুগোস্লাভ মিলিটারি একাডেমিতে সামরিক প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দেন। ১৯৭৪ সালের বসন্তে ঢাকা কলেজের ছাত্র জামাল যুগোস্লাভিয়ার মিলিটারি একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু একেবারে ভিন্ন পরিবেশ, প্রতিকূল আবহাওয়া আর ভাষার অসুবিধার কারণে সেখানকার প্রশিক্ষণের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো শেখ জামালের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছিল। এই পরিস্থিতিতে মার্শাল টিটো শেখ জামালকে ব্রিটেনের স্যান্ডহার্স্টে প্রশিক্ষণ গ্রহণের পরামর্শ দেন।

স্যান্ডহার্স্ট একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ শেষে ফিরে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট শেখ জামালের পোস্টিং হলো ঢাকা সেনানিবাসস্থ দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। ব্যাটালিয়নের চার্লি কম্পানির কম্পানি কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া বীরপ্রতীক। ক্যাপ্টেন নজরুলের অধীনে শেখ জামালের রেজিমেন্ট জীবনের হাতেখড়ি হলো ‘কম্পানি অফিসার’ হিসেবে। ইউনিটে যোগদানের দিন সেনাবাহিনীর খাকি ইউনিফর্ম পরে বাড়িতে ফেরেন শেখ জামাল। মুগ্ধ চোখে স্মার্ট এক আর্মি অফিসারকে দেখেন পিতা শেখ মুজিব ও মা বেগম ফজিলাতুন নেছা।

দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলে জামালের চাকরিকাল ছিল প্রায় দেড় মাস। কিন্তু এই স্বল্প সময়ে অফিসার ও সৈনিকদের মাঝে তিনি অসাধারণ পেশাগত দক্ষতা ও আন্তরিকতার ছাপ রেখেছিলেন। কয়েক সপ্তাহেই জামাল অফিসার ও সৈনিকদের মধ্যে তাঁদেরই একজন হয়ে যান। সকালে পিটির সময় সৈনিকদের আগে থেকে দৌড়ে সবাইকে অবাক করে দেন শেখ জামাল। ট্রেনিং গ্রাউন্ডে, রণকৌশলের ক্লাসে, অবস্টাকল ক্রসিংয়ে অংশ নিয়ে সৈনিকদের মুগ্ধ করেন। ব্যাটালিয়ন বক্সিং টিমের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেন। বিকেলে খেলার মাঠে ইউনিটের সদস্যদের সঙ্গে বাস্কেট বল খেলেন।

একদিন আদেশ হলো—গাড়িতে নয়, অন্য তরুণ অফিসারদের মতো মোটরসাইকেলে ক্যান্টনমেন্টে যাবেন শেখ জামাল। লক্ষ্মী ছেলের মতো মায়ের কড়া আদেশটি হাসিমুখে মেনে নিয়েছিলেন। ১৪ আগস্ট রাতে ব্যাটালিয়ন ডিউটি অফিসার হিসেবে ক্যান্টনমেন্টে আসেন তিনি। একজন সুবেদার বলেন, ‘স্যার, অনেক রাত হয়েছে; আজ রাতে ইউনিটেই থেকে যান।’ কিন্তু রাতে আর সেনানিবাসে থাকা হয় না শেখ জামালের। তিনি ফিরে আসেন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে। বাংলাদেশের কলঙ্ক ‘ঘাতকদল’ ততক্ষণে প্রস্তুতি নিচ্ছে শতাব্দীর এক নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের জন্য। সমগ্র আরবের সুরভিত সুগন্ধি দিয়ে ধুলেও মুছবে না বীভৎস সেই কলঙ্কের দাগ…।

শেখ জামালের জীবন ছিল খুব সংক্ষিপ্ত, ২৮ এপ্রিল ১৯৫৪ থেকে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। শেখ জামাল এখন ঘুমিয়ে আছেন বনানী কবরস্থানে। আজকের এই দিনে একজন অকালপ্রয়াত কিশোর মুক্তিযোদ্ধা, দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তা, বন্ধু অন্তপ্রাণ ও সাহসী তরুণের কথা স্মরণ করি বিনম্র শ্রদ্ধা ভরে।

লেফটেন্যান্ট শেখ জামাল, স্যালুট টু ইউ স্যার।

লেখক : বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানার সাবেক ডেপুটি কমান্ড্যান্ট

সৌজন্যেঃ কালের কণ্ঠ