‘অতিরাজনীতি’ নিয়ে শিক্ষার্থীদের সতর্ক করলেন শিক্ষামন্ত্রী
ঢাকা
মঙ্গলবার
১১ আগস্ট ২০২৬ ইং
২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ডেস্ক রিপোর্ট | তারারদেশ নিউজ:
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও গবেষণায় মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে রাজপথের ঘনঘন আন্দোলন নিয়ে সতর্ক করেছেন শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন। তাঁর অভিযোগ, সরকার শিক্ষা খাতের দীর্ঘদিনের সংকট কাটাতে কাজ করছে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় আন্দোলন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সেই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বার্ক) মিলনায়তনে ‘এডুকেশন ফর অ্যা রোবাস্ট ইকোনমি: স্কিলস, ল্যাঙ্গুয়েজ, অ্যান্ড গ্লোবাল ইকোনমি’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। এডুকেশন রিফর্ম ইনিশিয়েটিভ (ইআরআই) সেমিনারটির আয়োজন করে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্গঠনে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি আন্দোলনে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যার সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে শিক্ষার্থীরা সরাসরি তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতে পারে এবং তাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য তিনি প্রস্তুত। তবে অকারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত নয়, যাতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
দুই দশকের সংকট কাটানোর উদ্যোগ
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে দেশের শিক্ষা খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতার বিষয়টিও উঠে আসে। তাঁর মতে, গত দুই দশকে শিক্ষাব্যবস্থা নানা ক্ষেত্রে পিছিয়েছে।
চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে সমালোচনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ফলাফলের অবনতিকে কৃত্রিমভাবে তৈরি কোনো পরিস্থিতি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা মূল্যায়নের লক্ষ্যেই এবার পরীক্ষার মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কঠোরতা আনা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
শিক্ষা খাতে জিডিপির নিট ২ শতাংশ বরাদ্দের কথাও উল্লেখ করেন মন্ত্রী। একই সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৫০ হাজার এবং মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক পদ শূন্য থাকার তথ্য দেন তিনি।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি জটিলতা ও নিয়োগ-সংক্রান্ত জমে থাকা কাজ দ্রুত শেষ করে এনটিআরসিএ ও পিএসসির মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
৩১২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেনি
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ না হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন শিক্ষামন্ত্রী। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনিয়ন্ত্রিত অনার্স কোর্স চালু বন্ধ রাখার কথা জানান মন্ত্রী। উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য নিয়েও সতর্ক করেন শিক্ষামন্ত্রী। তাঁর দাবি, একটি অসম্পূর্ণ খসড়াকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে এবং এর জেরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের যোগসূত্র
সেমিনারে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের বড় জনসংখ্যাকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করতে হলে শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের বাস্তব চাহিদার সমন্বয় ঘটাতে হবে।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচলিত একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি চাকরি ও কর্মক্ষেত্রের উপযোগী দক্ষতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। শিক্ষকদের গবেষণায় আরও মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ তাঁর মূল প্রবন্ধে বলেন, শুধু জিডিপির আকার বাড়ালেই শক্তিশালী অর্থনীতি তৈরি হয় না। দক্ষ জনশক্তি, উৎপাদন সক্ষমতা এবং উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষাব্যবস্থার বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন বলেও মত দেন তিনি। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কী শিখছে এবং সেই জ্ঞান কর্মক্ষেত্রে কতটা কাজে লাগছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাথমিক পর্যায়ে পড়া, লেখা, গণিত ও যুক্তির মতো মৌলিক দক্ষতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের মান বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয় সেমিনারে।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের সুযোগ বাড়াতে ইংরেজির পাশাপাশি জাপানি ও মান্দারিনসহ বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।
সেমিনারে জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর, মার্কপলো এআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাসফিয়া তাসবিন, ইউনেসকোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুশান ভাইজসহ শিক্ষা, অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।
তারারদেশ নিউজ